আদর্শগত দ্বৈতনীতি রাষ্ট্রকে বিপদে ফেলবে |

দুই নৌকায় পা রেখে কূলে পৌঁছানো যায় না। এই মূল্যবান উক্তিটি পড়েছি ষাটের দশকে মাধ্যমিকে পড়ার সময়। তখন শিক্ষকরা কতভাবে এর ভাবসম্প্রসারণ উদাহরণসহ শিখিয়েছেন তা ভাবনায় এলে এবং আজকালকার পরিস্থিতি দেখলে মনে হয় এসব নীতিবাক্যের আর কোনো মূল্য নেই। আরেকটি দামি কথা সে সময় শিখেছি। ধন-সম্পদ যতই হোক, তার সঙ্গে যদি প্রকৃত শিক্ষা, নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ ও মননশীলতার সামঞ্জস্য না থাকে, তাহলে সেটি শান্তির চেয়ে অশান্তির কারণ হয় এবং শেষমেশ সেই সম্পদও বেশিদিন টিকে না।

স্বাধীনতার ৫০ বছরের মাথায় এসে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নতির পথে শুধু যাত্রাটা শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের পর থেকে পর্যায়ক্রমে বেড়ে ওঠা ধর্মীয় উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িকতা আজ যত বড় ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করছে এবং রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তার প্রভাব, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া যা দেখছি তাতে মাধ্যমিকে পড়া উপরোক্ত দুটি নীতিবাক্যের কথা বারবার আজ মনে পড়ছে। চরম ধর্মবাদী প্রভাবে-প্রাধান্যে সাম্প্রদায়িক দর্শনে পরিচালিত রাষ্ট্র কোনোকালে কোথাও উন্নত, সমৃদ্ধ, শক্তিশালী রাষ্ট্র হতে পারেনি, কথাটি সব ধর্ম ও সব অঞ্চলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। ওয়েস্টফেলিয়া (১৬৪৮) পূর্ব যুগে ইউরোপব্যাপী রাষ্ট্র পরিচালনায় খ্রিস্টান ধর্মবাদিতা এবং তার চরম পরিণতি আমার উপরোক্ত কথার উত্কৃষ্ট উদাহরণ। বর্তমান সময়ে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কিছু ধর্মবাদী রাষ্ট্র ধনী; কিন্তু উন্নত, সমৃদ্ধ, শক্তিশালী রাষ্ট্র নয়। একসময়ের ধনী রাষ্ট্র লিবিয়ার বর্তমান ধ্বংসযজ্ঞ অবস্থা কী শিক্ষা বহন করছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি হেফাজত এবং তার সঙ্গে বিএনপি, জামায়াতসহ সাম্প্রদায়িক পক্ষগুলো মিলে জাতীয় পতাকা পুড়িয়ে দেওয়া, জাতির পিতার ম্যুরাল ভাঙা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ যেভাবে ধ্বংস করেছে তা মোটেও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের লিগ্যাসি, পঁচাত্তরে জাতির পিতার হত্যাকাণ্ড এবং তার পর থেকে এ পর্যন্ত ধর্মীয় উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী, তার সঙ্গে পাকিস্তানপন্থী বড় রাজনৈতিক পক্ষসহ পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যেসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে তারই ধারাবাহিকতায় ঘটেছে সাম্প্রতিক ঘটনা, যেখানে এবার হেফাজতকে সামনে রাখা হয়েছে। ১৯৭৫ সাল থেকে বিগত ৪৫ বছর, বিশেষ করে গত ১০-১৫ বছর ধরে পর্যায়ক্রমে সম্মিলিত এই মুক্তিযুদ্ধ আদর্শবিরোধী এবং উগ্রবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর শক্তি কি বেড়েছে, নাকি কমেছে, নাকি একই আছে। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে যাঁরা বিশ্বাস করেন তাঁদের এই প্রশ্নটির নির্মোহ উত্তর বের করা জরুরি। সময় গেলে সাধন হয় না, কথাটি মনে রাখা দরকার।

হেফাজতে ইসলাম অর্থাৎ ইসলামের রক্ষাকারী। এই নামটাই বিভ্রান্তিমূলক। পবিত্র ইসলাম ধর্মের রক্ষাকারী স্বয়ং মহান আল্লাহ নিজে। পবিত্র কোরআন শরিফের সুরা ইয়াসিনের ৮২তম আয়াতের বাংলা অনুবাদ নিয়ামুল কোরআন গ্রন্থে যেভাবে আছে তা হলো, ‘যখন তিনি কোনো বস্তু সম্পর্কে ইচ্ছা করেন তখন তিনি বলেন—হও এবং তা হয়ে যায়।’ প্রায় দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে ইসলাম ধর্মের ক্ষতি কেউ করতে পারেনি। ইউরোপ-আমেরিকার মতো খ্রিস্টানপ্রধান দেশে কয়েক কোটি মুসলমান শান্তিতে বসবাস করছে, অসংখ্য মসজিদ সেখানে নির্মিত হয়েছে। এখনো নতুন নতুন মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে, কেউ তো বাধা দিচ্ছে না। ৩১ মার্চ এক সাবেক হেফাজত নেতা টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জামায়াত-হেফাজত বিদেশ থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা পাচ্ছে। কোন দেশ এই টাকা দিচ্ছে তা সবাই জানেন। নরেন্দ্র মোদির সফরকে ইস্যু বানিয়ে হেফাজতের রাষ্ট্রদ্রোহী তাণ্ডব যখন চলছে তখন পাকিস্তানের একটি সাময়িকী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবির প্রচ্ছদসহ বাংলাদেশের উন্নতি ও শেখ হাসিনার প্রশংসামূলক কয়েকটি প্রবন্ধ ছেপেছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে যাঁদের সামান্য ধারণা আছে, তাঁরা অবশ্যই বুঝেছেন এই প্রকাশনা পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের ব্রেনচাইল্ড বৈ অন্য কিছু নয়। পাকিস্তানের আইএসআই শেখ মুজিবের মেয়ে শেখ হাসিনার প্রশংসা করছে। সাধু! সাধু। ভূতের মুখে রাম নাম অশুভ বার্তা দেয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রধান ষড়যন্ত্রকারী আইএসআই। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গ্রেনেড ব্যবহার এবং পাকিস্তানি জঙ্গি মাজেদ ভাটের সরাসরি আক্রমণে অংশ নেওয়ার কাজটি করেছে আইএসআই। এই সময়ে এসে কী পরিবর্তন ঘটেছে, যার জন্য আইএসআই এখন শেখ হাসিনার প্রশংসা করছে। ব্যাপারটা কী! বাংলাদেশের রক্ষাকবচ বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ভূ-রাজনীতির বিবেচনার জায়গা থেকে এই আদর্শের প্রতিরক্ষার ফ্যাক্টরটি কী এবং তা কোথায় সেটি না বুঝে আইএসআইয়ের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে আমরা আবেগে আপ্লুত হলে তা আত্মহত্যার শামিল হবে। স্বয়ং পাকিস্তানের ঝানু পলিটিশিয়ান জুলফিকার আলী ভুট্টো আইএসআইয়ের পাতা ফাঁদে পড়ে ফাঁসিতে ঝুলেছেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতি এখন আদর্শের প্রশ্নে আপস এবং পরস্পরবিরোধী আদর্শগত দ্বৈতনীতিতে ঘুরপাক খাচ্ছে, যা দুই নৌকায় পা দেওয়ার সমান।

বিএনপি, জামায়াত, হেফাজত, জাতীয় পার্টিসহ ধর্মীয় দলগুলোর মৌলিক শিকড় এক জায়গায়। শুরু থেকে একটা মোটা ছদ্মবেশী আবরণের ফলে সত্তর-আশির দশকে তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশকে বিভ্রান্তিতে ফেলতে সক্ষম হওয়ায় আওয়ামী লীগের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবে বিএনপি আবির্ভূত হয়। কিন্তু একটা বড় জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার পরামর্শে বিএনপি জামায়াত-হেফাজতের পেটের মধ্যে ঢুকে গেছে। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ রক্ষার একমাত্র ভরসা আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি, জামায়াত, ফ্রিডম পার্টির অনুপ্রবেশ এবং তার সঙ্গে এক শ্রেণির নেতাকর্মীর চরম আদর্শগত পদস্খলনের পরিণতিতে হেফাজতের মতো চরম ধর্মীয় উগ্রবাদীদের সঙ্গে আপস করে চলতে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে। ফলে হেফাজত জাতীয় পতাকা পোড়ায়, জাতির পিতার ম্যুরাল ভাঙে, আর রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংগঠনগুলো নীরব নিস্তব্ধ থাকে।

মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের মাধ্যমেই স্বাধীনতা এসেছে, বাংলাদেশ আধুনিক রাষ্ট্রের পরিচয় পেয়েছে, উন্নতি সমৃদ্ধির সড়কে উঠেছে এবং আজকে এসে আগামী প্রজন্মের জন্য বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। অন্য কোনো বিকল্প বাংলাদেশের জন্য নেই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় আপস ও আদর্শগত দ্বৈতনীতির ফল কখনো ভালো হয়নি। একনাগাড়ে ৩০ বছর এবং তারপর বিভিন্ন মেয়াদে আরো ২৫ বছর মোট ৫৫ বছর ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেস এখন ভারতের একটা ক্ষয়িষ্ণু দলের নাম। এর পেছনে বহু কারণের সঙ্গে বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে আদর্শের জায়গায় আপস ও দ্বৈতনীতি, যা ঘটেছে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর। ইন্দিরা গান্ধী কখনো এই পথে হাঁটেননি। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় ক্ষমতায় ছিল প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস দল। শোনা যায়, বাবরি মসজিদ ভাঙার দিন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও সারা দিন পূজার ঘরে পূজায় নিমগ্ন ছিলেন বিধায় তাঁর কোনো সিদ্ধান্ত কেউ নিতে পারেননি। বাবরি মসজিদ ভাঙা শেষ হওয়ার পর নরসিমা রাও পূজা থেকে উঠলেন। সব শোনার পর সারা দেশে অতিরিক্ত ফোর্স হিসেবে সিআরপিএফ মোতায়েন এবং সেনাবাহিনীকে সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু রোগী তো এরই মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে। তারপর ডাক্তার ডেকে কোনো লাভ হয়নি। এই যে শুরু, তারপর আদর্শগত দ্বৈত রথে চলার পথপরিক্রমায় আজকে কংগ্রেস সর্বভারতীয় দলের মর্যাদা হারাতে বসেছে। আরেকটি জ্বলন্ত উদাহরণ দিই। আফগানিস্তানের মতো একটা বিপুল সম্ভাবনার দেশ শেষ হয়ে গেল, তার প্রধান কারণ রাষ্ট্র পরিচালনায় আদর্শগত দ্বৈতনীতি। ১৯১৯ সালে আমানউল্লাহ স্বাধীন আফগানিস্তানের প্রথম রাজা হিসেবে ব্যাপক সামাজিক সংস্কারসহ সত্যিকার একটা উদার আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তনের চেষ্টা করেন। কিন্তু ১৯২৯ সালে তিনি ক্ষমতা থেকে উত্খাত হয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। তারপর পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় আসেন নাদির খান, জহির শাহ এবং ১৯৭৩ সালে সরদার মুহম্মদ দাউদ। ১৯১৯ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল, সরদার দাউদ ক্ষমতা থেকে উত্খাত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় ৫৯ বছরে উল্লিখিত শাসকরা কেউই রাষ্ট্রকে একটি টেকসই সাংবিধানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। সংবিধান বা শাসনতন্ত্রের মূলমন্ত্র ও দর্শন অর্থাৎ রাষ্ট্রের ফাউন্ডেশনকে শক্তিশালী করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সবাই নিজেদের গদি রক্ষায় একবার একদিক তো আবার অন্যদিকে ঝুঁকেছেন এবং রাষ্ট্রের মৌলিক দর্শন ও আদর্শ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছেন। একবার ধর্মতন্ত্র, আরেকবার সেক্যুলার আদর্শ, আবার সেক্যুলার ও ধর্মতন্ত্রকে মিলিয়ে জগাখিচুড়ি করেছেন, যা শেষ বিচারে রাষ্ট্রকে দুর্বল করেছে এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে উসকে দিয়েছে। সুতরাং ইতিহাসের দেখানো পথ পরিষ্কার। আপস এবং আদর্শগত দ্বৈতনীতি রাষ্ট্র ও রাজনীতি কোনোটার জন্যই ভালো হয়নি।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক


Source: kalerkantho

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 + 20 =