দেশের বাইরে রপ্তানি হবে ইলিশ, সেই খবরে খুশি ব্যবসায়ীরা, তবে … |

ইলশেগুড়ি বৃষ্টি আর ভরা পূর্ণিমার কারণে মৌসুমের এই সময় চাঁদপুরের পাইকারি বাজারে ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে। স্থানীয় পদ্মা ও মেঘনা নদী ছাড়াও দক্ষিণের সাগর ও উপকূলীয় এলাকায় ধরা পড়তে শুরু করেছে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। আর নানা আকারের সেই ইলিশের চালানে সরগরম শহরের বড়স্টেশনের মাছঘাট। ইলিশের দরদামও বেশ ভালো পাচ্ছেন জেলে ও ব্যাপারীরা।

এদিকে, দেশের বাইরে ইলিশ রপ্তানি হবে। সেই খবরে খুশি মাছ ব্যবসায়ীরা। বুধবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বড়স্টেশন পাইকারি মাছের বাজারে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে এমন কর্মচাঞ্চল্য পরিবেশ। তবে মা ইলিশ রক্ষায় আগামী ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর এই ২২ দিন ইলিশ বিচরণের নদীগুলোতে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এমন খবর শুনে মাছ ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা নেমে এসেছে।

চাঁদপুর শহরের পাইকারি মাছের বাজার বড়স্টেশন। ইলিশের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি এই বাজার এখন বেশ সরগরম। কারণ, মৌসুমের এই সময় সাগর ও নদীতে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে। আর সেই মাছের চালান নিয়ে ফিরছেন জেলে ও ব্যাপারীরা।  পাইকারি এই বাজারটিতে নানা আকারের ইলিশ স্তুপ করে সাজিয়ে রাখা হচ্ছে। আর তা দেখে দরদাম করছেন পাইকারি ক্রেতারা। দক্ষিণের উপকূলীয় এলাকা থেকে এই বাজারে ইলিশ বিক্রি করতে আসা জেলে এবং ব্যাপারীরা জানান, দেশের অন্য বাজারের চেয়ে চাঁদপুরে দরদাম ভালো পাচ্ছেন তারা। তাই এখানেই ছুটে আসছেন। এমন পরিস্থিতিতে আকারভেদে ইলিশের দাম হাঁকছেন ব্যবসায়ীরা।  

চাঁদপুরের বড়স্টেশন পাইকারি মাছের বাজারে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে মৌসুমের এই সময় প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ হাজার মণ ইলিশ বেচাকেনা হয়। ভোলা, নোয়াখালীসহ আরো কিছু উপকূলীয় এলাকা থেকে জেলে এবং ব্যাপারীরা ইলিশের চালান নিয়ে চাঁদপুরে আসছেন। এদের মধ্যে ভোলার দৌলতখানের জেলে আনোয়ার হোসেন জানান, চট্টগ্রাম কিংবা বরিশালের আড়তের চেয়ে চাঁদপুরে দরদাম ভালো পাওয়া যায়। তাই খুব সহজে নদীপথে ট্রলারযোগে বড়স্টেশনে এসেছি।

নোয়াখালীর চেয়ারম্যান ঘাটের মাছ ব্যাপারী নজরুল ইসলাম জানান, চাঁদপুরের ব্যবসায়ীরা তাকেসহ আরো অনেককে দাদনে টাকা দিয়েছেন। সেই টাকা তারা নদীতে জেলেদের কাছে লগ্নি করেছেন। ফলে এখন ইলিশের ভরা মৌসুম। তাই সাগর ও উপকূলের নদীতে ধরা ইলিশ চাঁদপুরের মাছ ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে শুধু আনোয়ার হোসেন কিংবা নজরুল ইসলাম-ই নয়, আরো অনেকেই চাঁদপুরের বড়স্টেশনে ইলিশের চালান নিয়ে ছুটছেন।

এছাড়া চাঁদপুরের পদ্মা ও মেঘনা নদীতেও এখন কিছু ইলিশ ধরা পড়ছে। তবে আকারভেদে এসব ইলিশের দাম বেশ চড়া। বুধবার দুপুর পর্যন্ত স্থানীয় ইলিশ এক কেজির ওপর আকারের পাইকারি প্রতিমণ বিক্রি হয়েছে ৫২-৫৩ হাজার টাকা। আর এক কেজির নিচে ৮০০ গ্রামের বেশি ওজনের ৩৮-৪০ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে দক্ষিণের সাগর ও উপকূলের ইলিশ আকারভেদে প্রতিমণ ১৮ হাজার টাকা থেকে ৪২ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। তবে মা ইলিশ রক্ষায় আগামী ৪ থেকে ১৫ অক্টোবর এই ২২ দিন ইলিশ বিচরণের নদীগুলোতে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এমন খবর শুনে মাছ ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা নেমে এসেছে। অনেক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জেলে ও ব্যাপারীদের কাছে তাদের মোটা অঙ্কের দাদন দেওয়া আছে। সেই টাকা উঠাতে হতে ব্যবসায়ীদের দিকেও একটু নজর দিতে সরকারের প্রতি আহবান জানান তারা।

এদিকে, এখন ইলিশের চালান দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হলেও বিদেশে ইলিশ রপ্তানি হবে। এমন খবর পেয়ে দারুণ খুশি পাইকারি মাছ ব্যবসায়ীরা। চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতি লিমিডেটের সাধারণ সম্পাদক মো. শবেবরাত জানান, এই মূহূর্তে বিদেশে ইলিশ রপ্তানি করা হলে জেলে, ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। অন্যদিকে, সামনে মা ইলিশ ডিম ছাড়বে। এমন পরিস্থিতিতে একটু ভেবে-চিন্তে সরকারি অভিযান দেওয়ার দাবি জানান, চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতি লিমিডেটের সভাপতি আব্দুল বারী জমাদার মানিক।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত মাত্র ২০ ভাগ ইলিশের পেটে ডিম পাওয়া যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ১৫-২০ দিন পর মা ইলিশে পরিপূর্ণ ডিম পাওয়া যাবে। তাই মধ্য নভেম্বর পর থেকে মা ইলিশ রক্ষায় সরকারি অভিযান শুরু করার দাবি জানান তিনি। এতে প্রজনন মৌসুম কার্যকর করা যাবে। 

এই বিষয়ে ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিছুর রহমান জানান, বুধবার এই নিয়ে ঢাকায় মৎস্য অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্টদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় মা ইলিশ সংরক্ষণে চাঁদপুরের পদ্মা ও মেঘনাসহ অভয়াশ্রমগুলোতে আগামী ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত এই ২২ দিন সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। এই মৎস্যবিজ্ঞানি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে জেলে এবং ব্যবসায়ীদের কিছুটা ক্ষতি হলেও পরবর্তীতে এতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। অর্থাৎ ইলিশের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। তিনি বলেন, এরই মধ্যে পরিবেশগত কারণে ইলিশের পেটে ডিম পূর্ণ হতে শুরু করেছে।

প্রসঙ্গত, এর আগের বছরগুলোতে মধ্য নভেম্বরের পর থেকে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হলেও এবার তা ১০ দিন এগিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। যে ২২ দিন নদীতে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ওই সময় ইলিশ মজুদ, পরিবহন এবং বিক্রয়ও বন্ধ রাখার জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার।


Source: kalerkantho

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 − seven =