কুলাউড়ার ৬ মেধাবী শিক্ষার্থীর পরিবারে বইছে ঈদের আমেজ |

ঈদের এখনো ঢের বাকী। রমজানই শুরু হয়নি। অথচ কুলাউড়ার ৬ মেধাবী শিক্ষার্থীর পরিবারে বইছে ঈদের আমেজ। দেশের মেডিক্যাল কলেজগুলোতে নতুন শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস (২০২০-২১) ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে জাতীয় মেধা তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন ওই শিক্ষার্থীরা। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণে এক ধাপ এগিয়ে গেল তারা। অদম্য মেধাবী ৬ শিক্ষার্থীরা হলেন, হৃদি দে, ইফফাত জাহান প্রমি, অয়ন কুমার দে, জিল্লুর রহমান, নীলাঞ্জন চক্রবর্তী ও জুমারা বেগম। 

মেধাবী এই পরিবারগুলোতে এখন তাই হাসির ঝিলিক। আনন্দে উদ্বেলিত ওই ৬ মেধাবীর পরিবার, আনন্দিত এলাকাবাসীও। তাদের এ অর্জনে এলাকার অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন। মেডিক্যালে লেখাপড়ার সুযোগ পাওয়া ৬ শিক্ষার্থীরা বলছেন, মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়ে তারা ভীষণ খুশি। এতে তাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তাঁরা প্রত্যেকই ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করতে চান।

হৃদি দে : হৃদি দে কুলাউড়া পৌরশহরের শিবির রোড এলাকার বাসিন্দা ও পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গৌরা দে ও গৃহিণী প্রতিভা রাণী দেবের দ্বিতীয় কন্যা। হৃদির বড় বোন রিয়া দে’র পর এবার সেও মেডিক্যালে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। বড় বোন রিয়া দে হবিগঞ্জে শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজে অধ্যয়নরত। আর হৃদির ছোট বোন পর্ণা দে ৮ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। হৃদি দে এবার ঢাকা শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। এমবিবিএস পরীক্ষায় মার্কস পেয়েছে ৭৭.৭৫। তাঁর মেধা স্কোর ২৭৭.৭৫। মেরিট পজিশন ৪৭৯ অর্জন করেন।

হৃদি বলেন, জীবনযুদ্ধে বেশ কয়েকটি বিজয় এসেছে আমার। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো এ মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সুযোগ পাওয়া। ভর্তি পরীক্ষার তারিখ জানার পর প্রস্তুতি হিসেবে প্রতিদিন ১৫ ঘণ্টা করে পড়তাম। তিনি জানান, এসএসসিতে কুলাউড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ, এইচএসসিতে সিলেট জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ থেকে গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ লাভ করেন। এছাড়া ১০ম ও ৮ম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি, ৫ম শ্রেণিতে সাধারণ বৃত্তি লাভ করেন। আমার এ ফলাফল অর্জনের পেছনের বাবা-মা ও বড় আপার উৎসাহ সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করার। সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে চলছি।

ইফফাত জাহান প্রমি : প্রমি কুলাউড়া পৌর শহরের আহমদাবাদ এলাকার বাসিন্দা ও মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী মো. মোখলেছুর রহমান ও কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য সহকারী আছমা বেগমের মেয়ে। সে এবার সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। বড় বোন ইশরাত জাহান প্রিমা সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। ছোট ভাই ফাহিম আশরাফ মাহদী ৮ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। প্রমি এমবিবিএস পরীক্ষায় মার্কস পেয়েছে ৭৪.৫। তাঁর মেধা স্কোর ২৭৪.৫। মেরিট পজিশন ১১৭৮ অর্জন করেন।

প্রমি বলেন, মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সুযোগ পাওয়াটা আমার জীবনের বড় একটা অর্জন। ভর্তি পরীক্ষার তারিখ জানার পর প্রস্তুতি হিসেবে প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টা করে পড়তাম। এসএসসিতে কুলাউড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ফাইভ ও এইচএসসিতে সিলেট এমসি কলেজ থেকে গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ লাভ করেন। এছাড়া ৮ম ও ৫ম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করেন। 

তিনি জানান, ছোটবেলা থেকে মানুষের জন্য কিছু করার প্রবল ইচ্ছা ছিল। কখনো ইঞ্জিনিয়ার, কখনো শিক্ষক, কখনো ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করার প্রবল আগ্রহ জন্মাল। ভবিষ্যতে ভালো ডাক্তার  হয়ে মানুষের পাশে থাকব ইনশাআল্লাহ। আমার এ ফলাফল অর্জনের পেছনের বাবা-মা ও বড় আপার উৎসাহ সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে।

জুমারা বেগম : জুমারা বেগম কুলাউড়ার ভাটেরা ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর এলাকার বাসিন্দা মাওলানা আইয়ুব আলী ও গৃহিণী শাহানারা বেগমের মেয়ে। সে এবার ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। এমবিবিএসের রেজাল্টে মার্কস পেয়েছে ৭০.২৫। মেধা স্কোর ২৭০.২৫। ২৮৬০ মেরিট পজিশন অর্জন করে। 

জুমারা জানায়, সে কুলাউড়ার ভাটেরা স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস ও সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসিতে এ প্লাস লাভ করেন। পরিবারের ৪ বোন ও ১ ভাইয়ের মধ্যে জুমারা তৃতীয়।

জিল্লুর রহমান : মো. জিল্লুর রহমান কুলাউড়ার হাজিপুর ইউনিয়নের চান্দগাঁও গ্রামের বাসিন্দা, দলিল লেখক ও সাবেক ইউপি সদস্য এখলাছুর রহমানের দুই ছেলের মধ্যে ছোট ছেলে। তাঁর বড় ভাই মো. লুৎফুর রহমান কুলাউড়া কবিরাজী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। জিল্লুর এবার রংপুর সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় পড়ার সুযোগ পেয়েছে। এমবিবিএসের রেজাল্টে মার্কস পেয়েছে ৭১.৫। তাঁর মেধা স্কোর ২৭১.৫। ২২৫২ মেরিট পজিশন অর্জন করেন।

জিল্লুর রহমান জানান, সে শমসেরনগর বিএএফ শাহীন স্কুল এন্ড কলেজ থেকে গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ পেয়ে এসএসসি ও গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। বিএএফ শাহীন স্কুল এন্ড কলেজের ৫ম শ্রেণির প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিল সে। ৫ম শ্রেণি এবং ৮ম শ্রেণিতে জিল্লুর ট্যালেন্টপুল বৃত্তি লাভ করে। 

নীলাঞ্জন চক্রবর্তী : নীলাঞ্জন কুলাউড়ার বরমচাল ইউনিয়নের বাসিন্দা নিবাস চক্রবর্তী ও অজন্তা রানী দেবীর ছেলে। তাঁর বাবা নিবাস চক্রবর্তী ডলার এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী। সে এবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। এমবিবিএসের রেজাল্টে মার্কস পেয়েছে ৮০.২৫। মেধা স্কোর ২৮০.২৫। ২২৭ মেরিট পজিশন অর্জন করে। 

নীলাঞ্জন জানায়, সে বরমচাল স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসিতে এ প্লাস লাভ করে। ৫ম শ্রেণিতে সাধারণ বৃত্তি লাভ করে। তাঁর এ ফলাফলের পেছনে বাবা-মায়ের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন তাঁর চাচা বরমচাল স্কুল এন্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ (অব.) মৃত নিলয় চক্রবর্তী।

অয়ন কুমার দে : অয়ন কুলাউড়ার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামের বাসিন্দা মৃত নিধু রঞ্জন দে ও গৃহিণী অনিমা রানী দে’র ছেলে। অয়নের বাবা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ছিলেন। প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় ২০০৫ সালে ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে অয়নের বাবা মারা যান। বড় ভাই নয়ন কুমার দে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। অয়ন এবার ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। এমবিবিএসের রেজাল্টে মার্কস পেয়েছে ৭০। তাঁর মেধা স্কোর ২৭০। ২৯৩১ মেরিট পজিশন অর্জন করেন।

অয়ন কুমার দে জানান, সে লংলা আধুনিক ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ ফাইভ ও আলী আমজদ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে এসএসসিতে জিপিএ ফাইভ পান। এছাড়া ৫ম ও ৮ম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি ও ১০ম শ্রেণিতে সাধারণ বৃত্তি লাভ করেন। ভর্তি পরীক্ষার তারিখ জানার পর প্রস্তুতি হিসেবে প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা করে পড়তাম। ছোটবেলা থেকে ডাক্তার হওয়ার লক্ষ্যেই পড়াশোনা করেছি মায়ের অনুপ্রেরণা নিয়ে। বাবার পেনশনের টাকায় লেখাপড়ার খরচ চালাই। 


Source: kalerkantho

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × five =